‘সড়ক ভাঙা বলে মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাচ্ছিল’

0
41

অনলাইন ডেস্ক: ভোলার আলো.কম,

‘ভাই, বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, তবে সত্যি বলছি—রাস্তার কারণে মেয়ের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলেও আমাদের বাড়ির রাস্তা দেখে পাত্রপক্ষ পিছিয়ে যায়।’

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শফিকুল ইসলাম মানিকগঞ্জ-বালিরটেক-হরিরামপুর সড়কের বাঘিয়া বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে বলছিলেন কালের কণ্ঠকে। তিনি জানান, স্থানীয় কমিউনিটি হলে বিয়ের অনুষ্ঠান করার প্রস্তাব দিয়ে শেষ পর্যন্ত ছেলেপক্ষকে রাজি করানো হয়। মাঝখান থেকে অনেক টাকা খরচ করতে হয় অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষককে। ক্ষোভের সঙ্গে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এটা সড়ক, নাকি চষা ক্ষেত?’

একই সড়কের পুটাইল এলাকার পাশে বাড়ি সাংবাদিক আবুল বাশার আব্বাসির। একটি জাতীয় পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি বাশার মোটরসাইকেলে করে প্রতিদিন মানিকগঞ্জ প্রেস ক্লাবে আসেন। তিনি জানান, রাস্তার বেহাল অবস্থার কারণে আধাঘণ্টার পথ পার হতে হয় কমপক্ষে এক ঘণ্টায়। মানিকগঞ্জ জেলা শহর থেকে হরিরামপুর উপজেলার সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই রাস্তাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজধানী ঢাকা থেকেও এই সড়কপথে হরিরামপুর উপজেলার সরাসরি যোগাযোগ। বাস, মিনিবাস, প্রাইভেট কার, অটোরিকশা, ট্রাক, টেম্পোসহ সব ধরনের যানবাহন চলাচল করে। বছর দুয়েক আগে রাস্তাটি মেরামত করা হয়। কিন্তু ছয় মাস না যেতেই রাস্তার কার্পেটিং উঠে যায়।

মানিকগঞ্জের বেতিলা মোড় থেকে হরিরামপুর উপজেলা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার রাস্তার পুরোটাতেই দেখা গেছে গর্ত। গর্ত পার হওয়া ছাড়া এক কদমও এগোনো যায় না। এ জন্য প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনাও ঘটছে। বৃষ্টি হলে গর্তে পানি জমে রাস্তাটি আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠে। আবুল বাশার বলেন, ‘ফাঁকিবাজি কাজের কারণেই রাস্তার এ অবস্থা। দেড় বছর ধরে আমরা চরম দুর্ভোগে রয়েছি; কিন্তু কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

ওদিকে হেমায়েতপুর-সিংগাইর-মনিকগঞ্জ সড়কের যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েছে রাস্তা প্রশস্ত করার কাজের জন্য। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের হেমায়েতপুর থেকে সিংগাইর উপজেলা হয়ে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত চলছে প্রায় ৩১ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়কের সংস্কারকাজ। সড়কটি ১৭ ফুট থেকে ২৮ ফুট চওড়া করা হচ্ছে। কাজ শুরু হওয়ার পর সড়কটি যানজটের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এর বড় কারণ হচ্ছে নির্মাণসামগ্রী রেখে রাস্তাটি সংকুচিত করে ফেলা। সড়কের নিয়মিত যাতায়াতকারী মানিকগঞ্জ বারের আইনজীবী আকবর হোসেন বলেন, ‘কাজের যে গতি দেখছি তাতে কবে নাগাদ আমাদের এই দুর্ভোগ শেষ হবে তা কে জানে।’

সাটুরিয়া উপজেলাবাসীর দুর্ভোগের আরেক নাম মানিকগঞ্জ-সাটুরিয়া সড়ক। গুরুত্বপূর্ণ সড়কটির এখন এমনই বেহাল যে এক বছর ধরে কেউ আর এ মুখো হচ্ছে না। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গোলড়া থেকে সাটুরিয়ার বালিয়াটি জমিদারবাড়ি পর্যন্ত রাস্তার কার্পেটিং উঠে গেছে। তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত। বিশেষ করে সাটুরিয়া বাজার থেকে বালিয়াটি জমিদারবাড়ি পর্যন্ত বেশ কয়েকটি গর্ত রয়েছে প্রায় ডোবা আকৃতির। বালিয়াটি সুপারমার্কেটের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রায় দেড় বছর আগে রাস্তাটি মেরামত করা হয়। যেনতেন কাজের জন্য কয়েক দিন না যেতেই এই অবস্থা হয়েছে। তাঁর মতে, রাস্তা নষ্ট হওয়ার আরেকটি কারণ ট্রাক্টর। অবৈধভাবে পেছনে ট্রলি বসিয়ে ট্রাক্টর দিয়ে মাটি টানা হচ্ছে। এর বিশাল চাকায় দ্রুত রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে ট্রাক্টরের দুর্ঘটনায় এক স্কুলছাত্র নিহত হয়। রাস্তায় চলাচলের কোনো অনুমতি না থাকলেও পুলিশকে হাত করে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী মাটি ব্যবসায়ীদের শতাধিক ট্রাক্টর চলাচল করছে বলে তিনি জানান। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বালিয়াটি জমিদারবাড়ি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পর্যটন এলাকা। পর্যটকরা এসে রাস্তার কারণে দুর্ভোগে পড়ছে।

মানিকগঞ্জ জেলা শহরের সঙ্গে উপজেলাপর্যায়ের সড়কগুলোর অবস্থাও কমবেশি একই রকম। জেলা শহরের হিজুলি বাজারটি মরতে বসেছে মাত্র আধাকিলোমিটার বেহাল রাস্তার কারণে। বাজারসংলগ্ন মানিকগঞ্জ ডায়াবেটিক হাসপাতালের রোগীরাও পড়েছে বিপদে। দুই বছর ধরে রাস্তাটি ভাঙাচোরা। এর মধ্যে গত বছরের বন্যায় রাস্তাটি ডুবে যাওয়ায় অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। হাঁটতেও কষ্ট হয়। ফলে একসময়ের জমজমাট বাজারের ক্রেতা কমে গেছে প্রায় অর্ধেক। তবে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী বেল্লাল হোসেন জানান, গত বছরই রাস্তাটি টেন্ডার হয়েছে। কিন্তু ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণের সময় বড় বড় গাড়িতে মালপত্র আনা-নেওয়ার জন্য ঠিকাদার কাজ করতে পারেননি। তিনি আরো বলেন, ডায়াবেটিক হাসপাতাল নির্মাণ শেষ হলেও পাশেই শুরু হয়েছে প্যাথলজিক্যাল ইনস্টিটিউটের বিশাল ভবনের কাজ। সে কারণেও রাস্তার কাজ শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে। তবে কিছুদিনের মধ্যেই রাস্তার কাজ ধরা হবে বলে তিনি জানান।

অন্য সড়কগুলোর বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য হচ্ছে, আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই রাস্তা মেরামতের কাজ তারা শেষ করতে চায়।

(হামিদুর রহমান আজাদ, ১৭এপ্রিল,২০১৮ইং)

একটি উত্তর ত্যাগ

Please enter your comment!
Please enter your name here